নামহীন অপেক্ষার গল্প...


গল্পের শুরুটা আসলে কেমন হবে কেউ জানতো না, জানতো না ছেলেটা, জানতো না মেয়েটাও......
প্রতীক্ষায় ছিলো দু’জনই, বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে একসাথে ভেজার...
দুরুদুরু বুকে ছিলো অপেক্ষা, ছিলো স্বপ্নভঙ্গের একচিলতে ভয়ও, যদি এমন হয়, একদিন আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে, ঝুম বৃষ্টি, এমন যে সমস্ত রাস্তা জুড়ে জলের মিছিল থাকবে, সেই মিছিলে অদ্ভুতুড়ে দু’ একটা একলা ছেলেবেলা দৌড়ে পালাবে, থাকবে না মানুষ কিংবা কোন যানজট। কিন্তু...কিন্তু বৃষ্টিটা যদি নামে মাঝরাত্তিরে, বেরসিক বৃষ্টিটা যদি বুঝতেই না পারে, এই বিদঘুটে একটা সময়ে সমস্ত চরাচরকে বৃষ্টিতে ভেজাতে যেয়ে কী ভয়ংকর একটা স্বপ্নকে ভেঙ্গে ফেলছে সে?
সেই নিরাশা কিংবা আশার পেন্ডুলামে হঠাৎ করেই বুঝিবা হাওয়া লেগেছিলো।
বৃষ্টি কথা রেখেছিলো, বর্ষাকালের এক দুপুরবেলাতেই হঠাৎ করে তার মনে হয়েছিলো ইট-কাঠ-পাথরের এই একলা শহরটা ঘুরে আসার...
আর কেউ খেয়াল করেছে কী না জানি না, বৃষ্টি বাঁচিয়ে সাবধানী এই আমি ঠিকই দেখেছিলাম, একটা ঝাঁকড়া গাছের নিচে বসেছিলো তারা দু’জন, প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে যেতেই ছেলেটা ছটফট করে উঠেছিলো, মেয়েটার হাত ধরে বলেছিলো, “তোমাকে বলেছিলাম না, এবারের বর্ষার প্রথম বৃষ্টিটা তোমার আমার?”
মেয়েটা মৃদু হেসে মায়া ভরা একটা দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো ছেলেটার দিকে, কত দিনের পরিচয়, অথচ এখনো মনে হয় এই সেদিন...বাগানবিলাস ফুলের রঙ যে কমলাও হতে পারে, ছেলেটার অবাক চোখের সামনে তাই খুঁজে এনে দিয়েছিলো মেয়েটা প্রথমবার।
ছেলেটা বলেছিলো, “তুমি জানো? আমার একটা বিচ্ছিরি বাজে স্বভাব আছে, আমি ভুলে যাই অনেক কিছুই! একদিন যদি আমি ভুলে যাই কমলা রঙের বাগানবিলাস হয়, তখন?”
মেয়েটা হেসে উঠে ছেলেটার হাত ছুঁয়ে বলেছিলো, “সেদিন নাহয় আমিই আরেকবার মনে করিয়ে দেবো!”
তারপর অনেকগুলো সময় কেটে গেছে, বর্ষা গেছে, হালকা পেঁজা তুলোর মতো শরৎ গেছে, গেছে আনমনা উদাসী হেমন্ত, শীতের আসি আসি ভাব এখন ভীষণ...প্রায়ই ঘুরে যাচ্ছে এই শহরটা জুড়ে...
আমি প্রায় রোজই দেখি, এই মায়াবী শহরটার রাস্তা ধরে দুটো মানুষ গল্প করতে করতে হেঁটে যায়, তাদের গল্পে থাকে খুনসুটি, তাদের গল্পে থাকে অদ্ভুতুড়ে একটা মায়া, থাকে অদ্ভুত অবোধ্য একটা স্বপ্ন। তারা আনমনা বসে থাকে বাসস্ট্যান্ডের ছাউনিতে, তারা বসে থাকে চায়ের দোকানের নড়বড়ে বেঞ্চটিতে, তারা মেতে উঠে চা বিক্রি করতে লোকটার সাথে গল্পে...
আমি পাশ দিয়ে যাবার সময় তীক্ষ্ণ চোখে ছেলেটাকে খেয়াল করি, আমি এই ছেলেটাকে চিনি, আমি ওকে কোথাও দেখেছি...কোথাও, ঠিক কোথাও...খুব চেনা চেনা লাগে, কিন্তু তবু মনে করতে পারি না...
ল্যাম্পপোস্টের কমলা আলোতে আমার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে, আমি টের পাই আমার পাশ দিয়ে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, আমি নিতান্তই বেখেয়ালে হেঁটে যেতে থাকি আর মনে করার চেষ্টা করি ছেলেটাকে, লেকের পানিতে আছড়ে পড়া চাঁদের ছায়াও আমার সাথে দীর্ঘ হতে থাকে......
আনমনা হাঁটতে হাঁটতে এই আমি আবার আবিষ্কার করি আমি ওদের সামনেই ফিরে চলে এসেছি...
এখনো সেই চায়ের দোকানেই ওরা দু’জন। 
গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ পাশে দু’জনার।
ছেলেটা মেয়েটার হাতের মুঠোতে তুলে দিচ্ছে কিছু একটা...
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ছেলেটা অস্ফুটে মেয়েটাকে বলে, “জানো, এই বাক্সটা তুমি যখন খুলবে, দেখবে এর ভিতরে নূপুর আছে রুপার, আর সাথে একটা ছোট্ট ঘটনাও আছে...”
আমি ছেলেটার পাশে বসে চুপ করে শুনতে থাকি।
মেয়েটা উৎসুক হয়ে তাকায়।
“নূপুর কিন্তু একটাই আছে এখানে, কেন জানো?”
“কেন?”
“কারণ, আজ তোমার হাতে ডান পায়ের নূপুরটা তুলে দিলাম। বাম পায়ের নূপুরটা আমার কাছে থাকবে মেয়ে। যেদিন তোমার সাথে আমার বিয়ে হবে, বাসর রাতে, ধবধবে সফেদ জ্যোৎস্নার আলোতে আমি আরেকটা নূপুর তোমার পায়ে পড়িয়ে দিবো রাজকুমারী...”
মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি দেখতে পাই, মেয়েটার চোখের কোণটা চিকচিক করছে...এক বিন্দু জল, এক বিন্দু জল, এক বিন্দু ভালোবাসার মাঝে ডুবে থাকা জল, যেনবা বৃষ্টির সেই প্রথম ফোঁটা...
আমি ছেলেটাকে হঠাৎ করেই চিনতে পারি...
রাজকুমারীর হাত ধরে থাকা ছেলেটা উঠে দাঁড়ালো। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ভেসে যেতে থাকে চারিপাশ, আর তার মাঝে যেন স্বপ্নমাখা দুটো মানুষ হেঁটে যেতে থাকে......
আমি ও আমার রাজকুমারী...
রাজকুমারীর হাতে শক্ত করে ধরে রাখা, একজীবনের পাওয়া প্রথম নূপুরটা...
আর অপেক্ষায়, আরেকটির...

Post a Comment

0 Comments