ব্যক্তিত্ব


দাসপ্রথার আধুনিকায়নের এই সময়ে ’ব্যক্তিত্ব’ শব্দটি সংজ্ঞা হিসাবে যতটা না সুপরিচিত তার চেয়ে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এর ব্যবহার যথেষ্ঠ কুপরিচিত। এই শব্দটির সংজ্ঞা বোঝানের অভিপ্রায় নিয়ে আপনাদের এই লেখা পড়িয়ে আপনাদের পরমায়ু থেকে সময় ছিনিয়ে তার মন্ডুপাত করার অভিপ্রায় আমার নেই। তবে অধুনা কিছু তথাকথি ব্যক্তিত্ববান মানুষ অবিকশিত ব্যক্তিত্ত্ব প্রকাশের নামে ব্যক্তিত্ব নাশের যে কৌশল অবলম্বন করে তা নিয়ে দুটো চারটে কথা বলা যেতেই পারে। অবশ্যই এই লেখাটুকু পড়ে যে সময় টুকু নষ্ট হবে তা আগামি কাল অফিসের যাবার জন্য গাড়ীর পরিবর্তে দুই পা ব্যাবহার করে সে সময়টুকু পুনরুদ্ধার করে নিতে পারেন। একজন মানুষের গুণাবলী ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বিত একটি চিত্র যা তাকে একটি স্বতন্ত্র মানুষ হিসাবে অন্যদের থেকে পৃথক করে। ব্যক্তিত্ত্বের এই সংজ্ঞাকে আপনি corporatised মানুষগুলো কর্তৃক সত্য আড়াল করার নিমিত্তে এক স্ববিশেষ ছদ্মবেশ ধারন করার ষঢ়যান্ত্রিক শব্দ বলে গালি দিতে পারেন। যে সংজ্ঞাকে আপনি ভালবেসে বুকে টেনে নিলে কখনও প্রত্যাখ্যাত হবেন না, সেই সংজ্ঞাটি হলো, ‘প্রকৃতপক্ষে ইংরেজী personality শব্দটি Latin শব্দ persona থেকে এসেছে। যার অর্থ কোন মানুষ কর্তৃক বিশেষ কোন উদ্দেশ্যকে সামনের রেখে স্বতন্ত্র কোন Roll Play করার জন্য ছদ্মবেশ ধারন করাকে বোঝায়‘। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনি দেখতে পাবেন প্রথম সংজ্ঞাকে কেন্দ্র করে বস্তুত: দ্বিতীয় সংজ্ঞার প্রতিফলনই সকলে ঘটিয়ে থাকে। উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি আপনি যে অফিসে চাকুরী করেন সেখানে আপনি দুই শ্রেণীর মানুষের সাথে কাজ করতে গেলে আপনি খুব বিরক্ত হন। প্রথম জন : বয়স ও চাকুরীতে আপনার অনেক সিনিয়র, অভিজ্ঞতা দ্বারা চরম আক্রান্ত; জীবনে কখনও কোন কাজ নিজে করেছেন বলে মনে হয় না। তিনি যে সকল কাজ করে থাকেন সে সকল কাজ বিষয়ে তার সম্যূখ ধারনা বলতে যা বোঝায় তা তার একদম নাই। উনি সিনিয়র হিসাবে নানান সময় আপনাকে দিয়ে নানান ডকুমেন্ট তৈরী করে নিয়ে থাকেন, কারণ উনি জানেন উক্ত কাজটার জন্য আপনি উনার চেয়ে অনেক উপযুক্ত ব্যক্তি। আপনি খেটে খুটে সুন্দর করে ডকুমেন্টটা উনার সামনে নিয়ে গিয়ে বলেলন, ‘স্যার, আপনি যেটা তৈরী করতে বলেছিলেন আমি সেটা করে আপনাকে মেইল করে দিয়েছি; মেইল করে দিয়েছেন বল্লে উনি বলবেন, আপনি ওটা প্রিন্ট দিয়ে আনুন। আর আপনি যদি প্রিন্ট কপি হাতে নিয়ে বলেন স্যার আপনার কাজটা প্রিন্ট দিয়ে এনেছি। তখন উনি বলবেন, আপনি ওটা মেইল করে দেন। উনার সামনে গিয়ে যদি বলেন আমি ওটা মেইল করে দিয়েছি আবার প্রিন্ট দিয়েও এনেছি; ওনি কাগজটি দেখার পূর্বেইে আপনার কাজের কোন একটা ভুল ধরবেন, সেটা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় উনি কিছু সময়ের জন্য আপনার উপর কিঞ্চিত বিরক্ত হবেন। অত:পর বলবেন, অহেতুক প্রিন্ট দিয়ে কাগজ নষ্ট করার কি দরকার ছিল। আপনাদের অফিসের জিনিস পত্রের প্রতি একদম মায়া মমতা নেই; কেন? আপনি কখনও দেখেছেন, আমি অহেতুক অফিসের কোন কাগজ নষ্ট করেছি? তার এই প্রশ্নের উত্তরে তখন আপনি বলবেন, ‘জি স্যার, আমি অনেকবার দেখেছি; এইতো গত কয়েকদিন পূর্বে আপনার মেয়ের জন্য পুরা দেড়শ পাতার একটি বই প্রিন্ট দিতে সেটা দুই বার ভুল করেছিলেন, যারা জন্য অফিসের মোট 450 পাতা কাগজ আপনি নষ্ট করেছিলেন এবং সেটা আমার পরামর্শ অনুযায়ী প্রিন্ট না করাতেই হয়েছিল। না একথাগুলো আপনি জোরে বলেননি; মনে মনে বলেছেন, কারণ দাসেরা সরাসরি এসব কথা বলতে পারে না । যাই হোক; তখন হয়তো আপনার মহামাণ্য স্যার বলবেন, আচ্ছা এখন থাক পরে দেখবো। কাজটি দিয়ে আরামে চেয়ারে বসে আছেন, কানে ব্লুটুথ হেড ফোন লাগিয়ে হয়তো সাময়িক ভাবে রিল্যাক্স করার জন্য ইউটিউবে মেলোডিয়াস কোন গান শুনছেন; উনি তখন কাউকে দিয়ে আপনাকে ডেকে পাঠাবেন। অত:পর বলবেন। প্রিন্টার থেকে কাগজ দু’টো নিয়ে চেয়ারে বসেন। কাগজ দু’টো হাতে নিয়ে দেখলেন আপনার প্রস্তুতকৃত ডকুমেন্টটি। স্যার, এটাতো প্রিন্ট দেওয়া আছে; আবার প্রিন্ট দিলেন? স্যারের ভুল ধরার মত ভুল করায় উনি আপনার দিকে দৃষ্টির ছড়ি ঘোরাবেন, বলবেন, দু’পাতা কাগজের জন্য আপনার এত মায়া কান্না কাঁদতে হবে না, বসেন। লেখাটা কিছুক্ষণ পড়ার পর আপনার স্যার বলবেন, ’না, আমি লেখাটা যে ভাবেই চাইছিলাম তার কিছুই হয়নি; লেখাটা আমাকেই লিখতে হবে ’ ’স্যার তাহলে এটাকি আপনি কি নতুন করে লিখবেন?’ ’প্রেজেন্টেশান তো আগামিকাল, এখন কি লিখে শেষ করা যাবে, আচ্ছা মেইলে তো আছে দেখি আপনার লেখাটাই কাট-ছাট করে কিছু করা যায় কিনা’ দু’ঘন্টা পর উনি আপনাকে ডেকে বলবেন, ’লেখাটা আমি দেখে মেইল করেছি, আপনি শুধু কোন বানান ভুল আছে কিনা দেখে দেন’ ’ঠিক আছে স্যার’ মেইল চেক করে লেখাটা পড়ে দেখলেন ওনি একটি মাত্র ভুল সংশোধন করেছেন, আপনি যেখানে লিখেছিলেন, ‘welcome to our presentation’ উনি সংশোধন করে সেখানে লিখেছেন ‘well come to our presentation’. যেহেতু প্রেজেন্টশানটি উনিই উপস্থাপন করবেন এবং সমস্ত কৃতিত্ত্ব উনিই নিবেন, বসের এই ভুল সংশোধনের ভুলটি আপনি রেখেই দিলেন। পরের দিন তার ভুল সংশোধনের ভুলটাই যে একমাত্র ভুল ছিল, যা কেউ একজন প্রেজেন্টশান অনুষ্ঠানে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তার জন্য উনি লজ্জা কতটুকু পেয়েছিলেন তা কেউ জানতে পারলেন না, কিন্তু তার সাব-অর্ডিনেটকে দিয়ে যে সব কাজ ঠিক-ঠাক হয়না সেটা উনি যদি না ঠিক-ঠাক করে দেখেন, অন্তত: সেই বিষয়টা সকলে জেনে গেছেন। এবং অফিসের সকলেই উনার এই স্বভাব বিষয়ে জ্ঞাত এবং অবগত। তার অনুপস্থিতিতে উনার এহেন স্বভাবের কারণেই সকলের কাছে মোটামুটি একজন হাসির পাত্র। উনি এতটাই মূর্খ যে, তার এই মূর্খামি যে সকলের কাছেই জ্ঞাত সে বিষয়ে উনি যথেষ্ঠ অজ্ঞাত। ব্যক্তিত্ত্বের দ্বিতীয় সংজ্ঞা যা প্রকৃতপক্ষেই ব্যক্তিত্বের প্রকৃত সংজ্ঞা; যা আপনার এই মহা-মূর্খ স্যার রপ্ত করেছেন। কিন্তু উনার ফিতার জোর বেশি থাকায় উনার ফিতাতে কেউ হাত দিতে সাহস করে না। আর আপনি স্মার্ট হওয়া সত্ত্বেও আধুনিকায়নের এই দাসপ্রথায় দাস হিসাবে ঠিক-ঠাক আপনি আপনার রোল প্লে করে যাচ্ছেন। এই বার ব্যক্তিত্বের দ্বিতীয় গল্প : এইবার বলি জুনিয়র এক স্মার্ট নারী কলিগের কথা, কম বেশি আপনার কোন এক পাশের কোন এক চেয়ারে ইনি বসে থাকেন। খুব বেশি দিন হয়নি ইনি আপনার সাথে চাকুরী শুরু করেছেন। দেখে শুনে আপনি স্মার্ট বলে আপনার সাথে উনি একটা ভাব জমিয়ে ফেলেছেন। ভাবটার মধ্যে আপনি প্রেমময় একটা উষ্ণতা পাবেন। যে উষ্ণতা আপনার মাথা গুলিয়ে দিতে পারে। আপনার দিক থেকে সমস্যা হলো, চার পাশের গুঞ্জন, যে গুঞ্জনে আপনি শুনে আসছেন, আপনি নাকি স্মার্ট, এবং নিজের ব্যাপারে বহুল ব্যবহৃত এই শব্দটি আপনার বিশ্বাস করতে খুব ভাল লাগে বলেই আপনি তা আবার বিশ্বাসও করেন। নিজের প্রতি এই বিশ্বাসটাই আপনার সর্বনাশের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। আপনি ভাবতেই পারেন, যেহেতু আপনি স্মার্ট; হতেই পারে একটা সুন্দর ইয়াং মেয়ে আপনার প্রেমে পড়ছে। ইনি তার এই উষ্ণতা দিয়ে আপনার মাছের তেল দিয়ে তার মাছতো ভাজবেই এবং সেই তেল কিছুটা বোতলে করে তার বাসায় নিয়ে গিয়ে মাছ ভেজে তার প্রেমিকদেরকে খাওয়াবে... -----এই স্মার্ট বালিকার বাকি গল্প না হয় পরবর্তি পর্বে শোনাবো—এবং ভরসা রাখুন আমি লেখার ট্র্যাক থেকে ছিটকে পড়ছি না -----চলবে

Post a Comment

0 Comments