গল্পটা - ব্যাচেলরের


শাহবাগের মোড়ে বাস থেকে নেমে টিএসসির দিকে এগুচ্ছিলাম, ধীর পায়ে হাটতেছিলাম, হঠাৎ পিছন থেকে একটি মেয়েলি কন্ঠে ডাক এলো... - এই যে শুনুন মেয়েলি কন্ঠটি বেশ পরিচিত মনে হলো, যেনো বহুবছরের পরিচিত। কিন্তু এখানে আমাকে কে'বা ডাকবে, আমি তো এখানে নতুন, কে'বা চিনবে আমাকে । ভাবলাম, হয়তো অন্যকাউকে ডাকছে, তেমন কর্ণপাত করলাম না। আবার টিএসসির পথে এগুতে লাগলাম। কিন্তু বাধ সাধলো মেয়েলি কন্ঠটির পূনরাবৃত্তি। পিছনে ফিরে তাকালাম, আকাশী রঙের একটি শাড়ি পরিহিতা শ্যামবর্ণের মেয়েকে দেখতে পেলাম, মেয়েটির খোঁপায় রজনীগন্ধার মালা। অপুরূপ সাজে সজ্জিত মেয়েটি, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মেয়েটি দেখতে ভীষণ মায়াবী, চেহারায় ভেসে ছিলো মনমাতানো মিষ্টি হাসি। শাড়ীতে মেয়টিকে বেশ লাগছিলো, শাড়ী পরলে মেয়েদের সৌন্দর্যতা দ্বিগুন বৃদ্ধি পায়। মেয়েটি হয়তো টিএসসির পথ ধরে ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছিলো, কবিতা আবৃত্তি করবে হয়তো, কবিতাপ্রেমী মেয়েগুলোর মন ভীষণরকমের ভালো হয়, মেয়েটির মনও হয়তো ভালো । মেয়েটি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল ... - এই যে আপনাকেই বলছি, আমি নিজের দিকে আঙুল তাক করে বললাম, আমাকে...? মেয়েটি উত্তর দিলো, হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি, মেয়েটি কাছে আসলো এবং আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো.. - আমি রিমি, বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানে প্রথম বর্ষে পড়ছি, আপনার সম্পর্কে কিছু জানতে পারি...? ভীষণ অবাক লেগেছিলো তখন একজন অপরিচিতা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে আমার মতো অগোছালো মানুষের সম্পর্কে জানতে চেয়েছে! আমার নিকট স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছিলো, স্বপ্ন কিনা তা যাচাইয়ের নিজের হাতেই একটি চিমটি কাটলাম। মেয়েটি আমার চেহারার সম্মুখে হাত নাড়িয়ে বললো ... - হ্যালো, শুনুন, আপনি স্বপ্ন দেখছেন না, যা ঘটেছে সব বাস্তবেই। এবার আপনার সম্পর্কে কিছু বলুন। - কি বলবো আমি...? - আপনার নিজের সম্পর্কে, নাম , কি করেন না করেন সব কিছু শুনতে চাই - ওহ, আমি হিমেল, প্রফেশনালি লাইফ বলতে আমি একজন ভবঘূরে। - ভবঘূরে ...? মানে কি..? ফাইজলামি কইরেন না তো, মেয়ে দেখলেই ভাব বেড়ে যায় ...? - শেষের কথাটি আপনার কন্ঠে মানান সই না, আপনি তো কবিতা আবৃত্তি করতে যাচ্ছেন, কবিতা পড়ুয়া মেয়েদের মুখে মিষ্টি কথাগুলোই মানায় ভালো। - আপনি কিভাবে জানলেন আমি কবিতা আবৃত্তি করতে যাচ্ছি - কখনো কখনো কিছু অজানা জানা হয়ে যায়, আর কবিতা পড়ুয়া মেয়েদের একপলক দেখলেই বুঝা যায় ওরা কবিতা খুব ভালোবাসে। - বাহ, আপনার দূরদর্শিতা অনেক - মোটেও না, এখন বলুন ডেকেছেন কেনো...? - আপনাকে আমার ভীষণ পরিচিত মনে হয়, আপনার সত্যিকারের পরিচয়টা কি বলবেন প্লিজ ..? - কিভাবে সম্ভব আমিতো আপনাকে কখনো দেখছি বলে মনে হয় না, আমার পরিচয় তো বললাম'ই - জানিনা কেনো জানি আপনাকে আমার ভীষণ আপন মনে হচ্ছে। অবাক করা বিষয়, শহরে যখন সব'ই আমার অপরিচিত সেখানে মেয়েটি আমাকে হুট করে'ই বলে ফেললো আমি নাকি তার আপন কারো মতো। হয়তো মেয়েটি চোখে ভুল দেখেছে নয়তো প্রতারক চক্রের কেউ হবে। এপ্রকার সন্দেহ কাজকরতে লাগলো আমার মাঝে, আজকাল রাজধানীতে প্রতারক দল বিভিন্নভাবে প্রতারণার চক্র সাজায়, তাহলে কি মেয়েটিও সেই কোনো প্রতারক দলের সদস্য নাতো..? তা না হলে এমন উদ্ভট টাইপের একজন মানুষ কে তার কিভাবে আপন হয়, যাকে সে কোনো দেখেইনি। আমি তাড়া আছে বলে পাশকাটিয়ে উল্টো পথে সোজায় বাসায় ফিরে গেলাম। আমার কানে বারবার মেয়েটির কথা বাজছিল, মেয়েটির মায়াবী চেহারা দুচোখের সম্মুখে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। এ..কি..! মেয়েটির কথা কেনো বারবার আমার মনে পড়ছে, আমি কি মেয়েটির প্রেমে পড়লাম নাকি..? কারো প্রেমে পড়লে নাকি সারাক্ষণ তার চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খায়, তাকে দেখতে মন ছুটে যাওয়া। আমার ও তো তেমন হচ্ছে তাহলে কি মেয়েটির প্রেমে পড়লাম নাকি। মেয়েটির কথা ভাবতে ভাবতেই চোখের কোনে ঘুম নেমে আসলো, ঘুমের মধ্যে নীল রঙের শাড়ী পরে নীল পরীর বেশে মেয়েটির আগমন। তাহলে কি সত্যি'ই আমি মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেলাম। মেয়েটির চেহারায় একপ্রকার যাদু আছে, যে যাদু আমার মনে মেয়েটিকে বারবার মনে করে দিচ্ছে। ভবঘূরে জীবনে এমন উদ্ভট চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে বেরিয়ে পড়লাম চার দেওয়ালের বন্ধীখানা থেকে। আজকাল ঢাকাশহরে ব্যাচেলরদের জীবনকাটে একদম অসহ্যরকমের বিরক্তি নিয়ে । বাড়ির সবচেয়ে নিম্ন ঘরটি ব্যাচেলরদের জন্য বরাদ্দ রাখে বাড়িওয়ালারা। এরপর সময় অসময় বাড়িওয়ালার কথা শুনা ব্যাচেলরদের বর্তমানকালের চিরাচরিত অভ্যেসে পরিণত। ব্যাচেলরদের সাথে বাড়িওয়ালাদের এমন দা-কুমড়া সম্পর্কের যুক্তিসঙ্গত কারন আজও কারো জানা হয়নি হয়তো। সকাল থেকেই মেয়েটির ঘোরে মজেছিলাম, ঘোর কাটাতে বাহিরের বাতাসে মিশে থাকা প্রকৃতিতে নিজেকে হারাবো বলে চারদেয়াল থেকে বেরুতে না বেরুতেই বাড়িওয়ালার কর্কশ কন্ঠ শব্দ করে উঠলো :- হিমেল তোমাকে না বললাম ছাদে যাওয়া নিষেধ, এখন কি ছাদের দিকে যাচ্ছো...? কথাটি ভীষণ অসহ্য লাগলো , যাচ্ছি বাহিরে আর উনি এসে বললেন ছাদে না যেতে। আচ্ছা ব্যাচেলরদের সাথে ছাদের সম্পর্ক কি.? সববাড়িওয়ালার ক্যান নিষেধ থাকে ব্যাচেলরদের ছাদে যেতে..? ওনাকে নিরাশা করে বললাম :- আঙ্কেল আমি ছাদে যাচ্ছি না, আমি বাহিরে যাচ্ছি। আর আপনার ছাদে যাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই। বেচারা একবারে নিশ্চুপ হয়ে গেলো, যা একটু ক্ষমতা দেখাতে গেলো আর অমনিতেই আমার ছাদে যাওয়ার ইচ্ছে নেই শুনে বেচারার ক্ষমতা দেখানোর শক্তিটা শেষ হয়ে গেলো । বাড়িওয়ালাদের এই একটা সমস্যা ব্যাচেলরদের যেখানে - সেখানে ক্ষমতা দেখায়। বাড়ি ভাড়া দেবার সময় কত শর্ত জুড়ে দেয় যা আর লিখে শেষ করা যাবে না । বাড়িওয়ালা চাচাকে পাশ কাটিয়ে চলে আসবার সময় উনি আবার ডাক দিয়ে বললো - হিমেল কথা শুনো আমি চাচাকে বললাম :- জ্বী আঙ্কেল, বলুন উনি বললেন :- আজ তো মাসের দশ তারিখ, ভাড়া তো এখনো দিলে না আমি করুনার সূরে বললাম :- আঙ্কেল আর দুইটা দিন সময় দিন, টিউশনির টাকাটা হাতে আসলেই দিয়ে দিবো । উনি বললেন :- দুইদিন মাত্র, এর বেশি যেনো না হয়। আমি বললাম :- আচ্ছা। ব্যাচেলর লাইফ টা অনেক সংগ্রাম মুখর, বাস্তবতার সাথে প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করে কাটাতে হয় । থাকা - খাওয়ায় কষ্ট, মাস শেষে বাসা ভাড়া জোগাড় করা এবং আরো নানা প্রকারের কষ্টের শিকার হতে প্রতিনিয়ত। একমাসের উপরে হলো টিউশনিটা করাচ্ছি কিন্তু এখনো টাকা দেওয়ার কোনো খবর নেই। চক্ষু লজ্জায় টিউশনির টাকাটা ও চাওয়া যাচ্ছে না, যদি আবার কিছু মনে করে টিউশনিটা চলে যায়, তাহলে স্বার্থপর এই শহরে আরও বিপাকে পড়তে হবে। মনটা ছোট হয়ে গেলো, দুদিন পর বাসা ভাড়াটা কিভাবে জোগাড় করবো, বাড়িওয়ালা চাচার কথা শুনতে হবে ভাড়া না দিতে পারলে। সিড়ি বেয়ে নিচে চলে গেলাম, টং দোকান থেকে গোল্ডলিফের প্যাকেট নিয়ে একটি সিগারেটে জ্বালিয়ে আনমনে হাটতে লাগলাম। (অসমাপ্ত) পাঠক পড়তে চাইলে বাকি অংশগুলো দিবো । #চাইরচোখ

Post a Comment

0 Comments